২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

সংঘাতের অবসান, সহাবস্থানের সূচনা

ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের দ্বন্দ্ব নিরসনে জাতীয় নেতৃত্বের ঐক্য কেন অপরিহার্য

আপলোড সময় : ২৩-০৪-২০২৬
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের দ্বন্দ্ব নিরসনে জাতীয় নেতৃত্বের ঐক্য কেন অপরিহার্য


// মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময়ই পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামেও ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অনন্য। 
স্বাধীনতা পরবর্তী নব্বই ও ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্র সমাজ নেয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

সেই ঐতিহ্য আজও প্রেরণার উৎস। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে ছাত্ররাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে সহিংসতা, বিভাজন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে চলমান সংঘাত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংঘাত কেবল দুটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে উত্তেজনা, ভীতি এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার চেয়ে নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত। শিক্ষকদের ওপরও পড়ছে মানসিক চাপ। ফলে জ্ঞানচর্চার যে স্বাভাবিক পরিবেশ থাকা উচিত, তা ব্যাহত হচ্ছে বারবার। একটি জাতির ভবিষ্যৎ যেখানে গড়ে ওঠে, সেই স্থানগুলো যদি সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে সংসদ নেতা তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান- এই দুই নেতার মধ্যে একটি সুদৃঢ় ও আন্তরিক ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, মতাদর্শে পার্থক্য থাকতে পারে—কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে একটি ন্যূনতম সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।

ঐক্যমতের প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত হতে পারে। প্রথমত, এটি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, এটি রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, এটি শিক্ষাঙ্গনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, যা শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কেবল শীর্ষ পর্যায়ের ঘোষণা যথেষ্ট নয়—তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন এবং দখলদারিত্বের মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। পাশাপাশি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে কোনো সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

একইসঙ্গে সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত মতবিনিময় সভা, আলোচনা ও কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে তারা নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পাবে। এই ধরনের উদ্যোগ সহিংসতার পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে উৎসাহিত করবে।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং অভিভাবকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সচেতনতা তৈরি করতে পারেন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে এই সমস্যা সমাধান আরও সহজ হবে। একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, সংঘাত কখনোই স্থায়ী সমাধান নিয়ে আসে না; বরং তা বিভাজনকে আরও গভীর করে। সমাধান নিহিত রয়েছে সংলাপ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্যে। আজ যদি ডা. শফিকুর রহমান ও তারেক রহমান দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে একটি ঐক্যমতের ভিত্তি স্থাপন করতে পারেন, তবে তা শুধু একটি সংঘাতের অবসান ঘটাবে না—বরং বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। সেই প্রত্যাশাই আজ জাতির প্রতিটি সচেতন মানুষের।

লেখক: 
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com 
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ